বাঁশি শিক্ষা পর্ব ২: বাঁশি থেকে শব্দ বের করতে শেখা

বাঁশি শেখার যাত্রায় প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো যন্ত্রটি থেকে সঠিক ও মিষ্টি শব্দ বের করা। অনেকে ভাবেন এটি খুব সহজ কাজ—শুধু ফুঁ দিলেই হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে বাঁশি থেকে সেই প্রথম সুরটি বের করা একটি শিল্প, যা ধৈর্য, সঠিক কৌশল এবং সূক্ষ্ম অনুভূতির সমন্বয় চায়। এই পর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব কীভাবে আপনি আপনার বাঁশি থেকে প্রথম শব্দ বের করবেন, কীভাবে বসবেন, কীভাবে ফুঁ দেবেন এবং কীভাবে সেই শব্দকে মধুর ও স্থির করবেন।

[ পর্ব ২: বাঁশি থেকে শব্দ বের করতে শেখা ]

 

 

প্রথমে আরামদায়ক অবস্থান নিন

বাঁশি বাজানোর সময় শরীরের অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘক্ষণ বাজানোর সময় যদি পিঠ বাঁকা থাকে বা ঘাড় কুঁচকে থাকে, তাহলে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয় এবং শব্দের মান খারাপ হয়। তাই প্রথমে একটি চেয়ার বা মেঝেতে পা ভাঁজ করে আরামদায়কভাবে বসুন। পিঠ সোজা রাখুন, কাঁধ শিথিল করুন এবং মাথা সামান্য উঁচু রাখুন। বাঁশিটি ধরার জন্য বাম হাত নিচে এবং ডান হাত উপরে রাখুন (ডান-হাতি বাঁশির জন্য)। যদি আপনি বাম-হাতি হন, তাহলে বাঁশির ছিদ্রগুলো উল্টো দিকে থাকবে—সেক্ষেত্রে বিশেষ বাম-হাতি বাঁশি কিনতে হবে।

 

বাঁশি থেকে শব্দ বের করতে শেখা - Flute, Bansuri, বাঁশি, बांसुरी
Flute, Bansuri, বাঁশি, बांसुरी

 

 

 

বাঁশি ধরার সঠিক কায়দা

বাঁশির প্রধান ছিদ্রটি (যেখানে ফুঁ দিতে হয়) নিচের ঠোঁটের মাঝখানে রাখুন। নাকের ডগা বরাবর বাঁশির মুখটি রাখলে ফুঁ দেওয়ার কোণ সঠিক হয়। বাঁশির শরীরটি ঠোঁটের সাথে ৪৫° কোণে রাখুন—খুব সোজা বা খুব নিচু রাখলে শব্দ বের হবে না। বাম হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকা দিয়ে প্রথম তিনটি ছিদ্র বন্ধ করুন। ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকা দিয়ে পরের তিনটি ছিদ্র বন্ধ করুন। কনিষ্ঠা আঙুলটি অতিরিক্ত ছিদ্র (কড়ি মধ্যমের জন্য) বন্ধ করার জন্য ব্যবহার করুন।

 

Flute, Bansuri, বাঁশি, बांसुरी
Flute, Bansuri, বাঁশি, बांसुरी

 

ফুঁ দেওয়ার সঠিক কৌশল

বাঁশিতে ফুঁ দেওয়ার উপায় সাধারণ মোমবাতি নেভানোর মতো নয়। এখানে বাতাসকে খুব সরু ও নিয়ন্ত্রিত করে ছাড়তে হবে।

  • নিচের ঠোঁটটি সামান্য চ্যাপ্টা করুন।
  • দুই ঠোঁটের মাঝখানে একটি খুব সরু ফাঁক রাখুন—যেন বাতাস একটি পাতলা সুতোর মতো বের হয়।
  • জিভকে দাঁতে লাগিয়ে রাখুন এবং “তু” বা “টু” বলার মতো করে বাতাস ছাড়ুন।
  • বাতাসের গতি খুব কম রাখুন—জোরে ফুঁ দিলে শব্দ হবে “ফুশশশ” বা বিকট শব্দ।
  • বাতাস যেন বাঁশির মুখের ভেতরের দেয়ালে আঘাত করে ছড়িয়ে পড়ে—এটাই সঠিক ফুঁ।

প্রথমে খালি বাঁশিতে (সব ছিদ্র খোলা) ফুঁ দিয়ে দেখুন। শব্দ না আসলে বাঁশিটি ঠোঁটের সাথে একটু ঘুরিয়ে, উপরে-নিচে করে চেষ্টা করুন। সঠিক কোণ পেলে একটি স্থির ও মিষ্টি “আওয়াজ” বের হবে। এই আওয়াজটি হলো আপনার প্রথম সাফল্য।

 

দমের সাধনা ও প্রথম অনুশীলন

বাঁশি বাজানোর সবচেয়ে বড় গোপন কথা হলো দম নিয়ন্ত্রণ। শ্বাস নিতে হবে পেট থেকে (ডায়াফ্রাম থেকে), বুক থেকে নয়।

  • গভীরভাবে শ্বাস নিন—পেট ফুলে উঠবে।
  • ধীরে ধীরে সেই বাতাস বের করুন—যতক্ষণ সম্ভব লম্বা করে একটি স্থির শব্দ বের করার চেষ্টা করুন।
  • শুরুতে ৫-৭ সেকেন্ড লম্বা শব্দ বের করতে পারলেই ভালো। পরে ১৫-২০ সেকেন্ড পর্যন্ত বাড়ান।
  • এই অনুশীলন প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট করুন। এটি ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুরকে স্থির রাখতে সাহায্য করে।

 

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • প্রথম দিনগুলোতে খুব জোরে ফুঁ দেবেন না—এতে ঠোঁট ব্যথা হয় এবং রিডস নষ্ট হতে পারে।
  • শব্দ যদি “ফুশশশ” বা বাতাসের শব্দের মতো হয়, তাহলে বাতাসের কোণ ঠিক নেই।
  • যদি শব্দ না আসে, তাহলে বাঁশিটি একটু বাঁ দিকে বা ডান দিকে ঘুরিয়ে চেষ্টা করুন।
  • প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট অনুশীলন করুন—ধীরে ধীরে সুর স্থির হবে।
  • যদি সম্ভব হয়, একজন গুরুর কাছে প্রথম কয়েকটি ক্লাস নিন। ইউটিউবে মুস্তাকিম আবীর বা অন্যান্য বিখ্যাত বাঁশিবাদকদের ক্লাস দেখুন।

 

সহজে বাঁশি শিখুন বাঁশি শিক্ষা পর্ব ২: বাঁশি থেকে শব্দ বের করতে শেখা

 

বাঁশি থেকে প্রথম শব্দ বের করা যেন একটি দরজা খোলা—যার পিছনে অপেক্ষা করছে সাত সুরের অসীম সম্ভাবনা। এই প্রথম ধাপে ধৈর্য ও সঠিক কৌশলই আপনাকে সফল করবে। মনে রাখবেন, প্রতিটি মহান বাঁশিবাদকও একদিন এই প্রথম শব্দটির সাথে লড়াই করেছেন। আজ থেকে শুরু করুন—ধীরে ধীরে, ধৈর্য ধরে, প্রতিদিন একটু একটু করে। আপনার বাঁশির সেই প্রথম সুরই হবে আপনার সঙ্গীত যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। শুভকামনা—আপনার বাঁশি মধুর সুরে ভরে উঠুক! 🎶

 

Leave a Comment