বাঁশি শেখার যাত্রায় সবচেয়ে মৌলিক এবং আনন্দদায়ক অধ্যায় হলো স্বরগ্রাম বা স্বর বিন্যাস বোঝা। বাঁশি একটি শুষির বাদ্যযন্ত্র—অর্থাৎ ফুঁ (বায়ু প্রবাহ) দিয়ে সুর উৎপন্ন হয়। এখানে আঙুলের অবস্থান, বায়ুর নিয়ন্ত্রণ এবং শ্বাসের গভীরতার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় সেই মধুর সুর, যা শ্রোতার হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। সাধারণত ছয়টি ছিদ্রবিশিষ্ট বাঁশিতে সংগীতের সাতটি শুদ্ধ স্বর—সা, রে (কর্ণাটক সংগীতে ‘রি’), গ, ম, প, ধা ও নি—সহজেই বাজানো যায়। এই স্বরগুলোই বাঁশির মূল ভিত্তি এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সাত সুরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
বাঁশি শিক্ষা স্বরগ্রাম

বাঁশির মূলসুর ও স্বর উৎপাদনের মৌলিক নিয়ম
বাঁশির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “মূলসুর” বা বেস স্বর। যখন বাঁশির সব ছিদ্র বন্ধ থাকে, তখন যে স্বরটি উৎপন্ন হয়, সেটিকেই ওই বাঁশির মূলসুর বলা হয়। প্রচলিত বাঁশি শিক্ষায় এই মূলসুরকে সাধারণত ‘প’ (পঞ্চম) হিসেবে ধরা হয়। এরপর ধাপে ধাপে ছিদ্র খোলার মাধ্যমে স্বরের পরিবর্তন ঘটে। বাঁশির বন্ধ প্রান্ত (যেটি মুখের বিপরীতে থাকে) থেকে দূরের দিকে ছিদ্রগুলো গণনা করলে স্বরগ্রাম নিম্নরূপ হয়:
- সব ছিদ্র বন্ধ → প (পঞ্চম)
- সবচেয়ে দূরের ছিদ্র খুললে → ধা
- দুটি ছিদ্র খুললে → নি
- তিনটি ছিদ্র খুললে → সা (ষড়্জ)
- চারটি ছিদ্র খুললে → রে
- পাঁচটি ছিদ্র খুললে → গ
- ছয়টি ছিদ্র খুললে → ম (মধ্যম)
এই ধারাবাহিকতাই বাঁশির মৌলিক স্বরগ্রামের ভিত্তি। এর মাধ্যমে মধ্য সপ্তকের (মধ্য অক্টেভ) স্বরগুলো সহজেই বাজানো যায়।

বাঁশির মাত্রা ও স্কেল
প্রতিটি বাঁশিরই একটি নির্দিষ্ট স্কেল বা মাত্রা থাকে, যা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর:
- বাঁশির দৈর্ঘ্য — লম্বা বাঁশিতে সুর গভীর ও নিম্ন হয় (যেমন C বা B স্কেল)।
- অভ্যন্তরীণ ব্যাস — ব্যাস কম হলে সুর উচ্চ হয়, বেশি হলে গভীর হয়।
- ছিদ্রের আকার ও অবস্থান — ছিদ্রের ব্যাস ও দূরত্ব স্বরের স্থিরতা ও মিষ্টতা নির্ধারণ করে।
সাধারণত ছোট বাঁশি (৩০-৪৫ সেমি) G বা A স্কেলের হয়, আর লম্বা বাঁশি (৬০-৭৫ সেমি) C বা B স্কেলের হয়। এই কারণে রাগের প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন স্কেলের বাঁশি ব্যবহার করতে হয়। একজন পেশাদার বাঁশিবাদকের কাছে সাধারণত ১২টি বাঁশি থাকে—প্রতিটি স্কেলের জন্য আলাদা।

সপ্তক সৃষ্টি ও বায়ু নিয়ন্ত্রণ
বাঁশিতে স্বর উৎপাদনের ক্ষেত্রে আঙুলের অবস্থানের পাশাপাশি বায়ুর বেগ ও চাপ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- মন্দ্র সপ্তক (নিম্ন অক্টেভ) — বায়ুর চাপ কম রাখলে গভীর সুর বের হয়।
- মধ্য সপ্তক — স্বাভাবিক চাপে মধ্যম সুর।
- তার সপ্তক (উচ্চ অক্টেভ) — বায়ুর বেগ বাড়িয়ে দিলে স্বর উচ্চতর হয়।
এই বায়ু নিয়ন্ত্রণের কৌশল আয়ত্ত করাই বাঁশি শিক্ষার অন্যতম মূল ভিত্তি। শ্বাস পেট থেকে (ডায়াফ্রাম থেকে) নিতে হবে, বুক থেকে নয়। দীর্ঘ ও স্থির শ্বাসের অনুশীলন করলে সপ্তক পরিবর্তন সহজ হয়।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
বাঁশির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। বেদ, পুরাণ, মহাভারত ও রামায়ণে বাঁশির উল্লেখ রয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রাচীন মন্দিরের ভাস্কর্যে বাঁশি দেখা যায়। বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণের চিত্রায়ণে বাঁশি অবিচ্ছেদ্য। কৃষ্ণের মোহন বাঁশি, রাধার প্রেম, বৃন্দাবনের লীলা—সবকিছুতেই বাঁশি একটি গভীর প্রতীক। শৈব ধর্মীয় সাহিত্যেও বংশীর উল্লেখ আছে। মধ্যযুগে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও বালি অঞ্চলের মন্দির ভাস্কর্যে বাঁশিকে “ওয়াংসি” নামে উল্লেখ করা হয়েছে—যা প্রমাণ করে বাঁশির প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাঁশির স্বরগ্রাম শুধু সাতটি স্বরের বিন্যাস নয়—এটি প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানব হৃদয়ের গভীর সংযোগ। বায়ুর সঠিক নিয়ন্ত্রণ, আঙুলের সূক্ষ্ম অবস্থান এবং সঠিক স্কেলের বাঁশি—এই তিনটির সমন্বয়ে বাঁশি থেকে বের হয় সেই মোহন সুর, যা শ্রোতাকে ভক্তি, শান্তি ও আনন্দে ভরিয়ে দেয়। বাঁশি শেখার এই পর্বে স্বরগ্রাম বোঝা মানে বোঝা যে, কীভাবে একটি সাধারণ বাঁশের টুকরো মানুষের শ্বাস ও আঙুলের স্পর্শে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আসুন, এই স্বরগ্রামের মাধ্যমে আমরা বাঁশির সেই অমর সুরকে হৃদয়ে ধারণ করি। শুভকামনা আপনার বাঁশি যাত্রায়!
