বাঁশির ঘরানা পরিচিতি

ভারতীয় সঙ্গীত সংস্কৃতিতে বাঁশি বা বাঁশুরি একটি অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র। এটি কেবল একটি বাঁশের তৈরি ফুঁ-বাদ্য নয়, বরং ভক্তি, প্রকৃতি, মানবিক আবেগ ও আধ্যাত্মিক অনুভবের প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে বাঁশুরির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এই যন্ত্রটিকে লোকজ ও ধর্মীয় পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। পরবর্তীকালে, এই বাঁশুরিই ধীরে ধীরে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল ধারায় প্রবেশ করে এবং গড়ে ওঠে বিভিন্ন বাঁশুরি ঘরানা বা সঙ্গীতধারা।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ঘরানা বলতে কেবল ভৌগোলিক অঞ্চল বোঝায় না। ঘরানা হলো একটি পরম্পরা—যেখানে নির্দিষ্ট রাগ-ভাবনা, স্বরপ্রয়োগ, অলঙ্কার, তালবোধ, রেয়াজ-পদ্ধতি এবং দর্শন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। যদিও ধ্রুপদ, খেয়াল, সেতার বা তবলায় ঘরানা প্রথা সুপ্রতিষ্ঠিত, বাঁশুরির ক্ষেত্রে ঘরানা গঠনের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন এবং মূলত বিংশ শতাব্দীতে বিকশিত।

এই প্রবন্ধে আমরা বাঁশুরির প্রধান ঘরানাগুলির উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রধান শিল্পী এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাদের অবদান আলোচনা করব।

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বাঁশুরির বিবর্তন

ঐতিহাসিকভাবে বাঁশুরি ব্যবহৃত হতো—

  • লোকসঙ্গীতে
  • মন্দির ও ভক্তিমূলক পরিবেশনে
  • গ্রামীণ ও রাখাল সংস্কৃতিতে
  • কীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলীতে

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে বাঁশুরি ধীরে ধীরে শাস্ত্রীয় মঞ্চে স্থান পায়। ফ্রেটবিহীন এই যন্ত্রে শুদ্ধ স্বর, মীন্ড, গামক ও বিস্তৃত আলাপ পরিবেশন করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায়, বাঁশুরিকে শাস্ত্রীয় যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গভীর সাধনা ও নবীন কৌশলের প্রয়োজন হয়।

বাঁশুরি ঘরানার বিকাশের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—

  • রাজদরবারের পতন
  • বেতার ও গ্রামোফোন সংস্কৃতির উত্থান
  • প্রকাশ্য কনসার্ট প্রথা
  • সংগীত শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

 

পন্ডিত পান্নালাল ঘোষ

 

পন্নালাল ঘোষ ঘরানা (আধুনিক শাস্ত্রীয় বাঁশুরির ভিত্তি)

প্রতিষ্ঠাতা: পণ্ডিত পন্নালাল ঘোষ (১৯১১–১৯৬০)

পণ্ডিত পন্নালাল ঘোষ আধুনিক শাস্ত্রীয় বাঁশুরির জনক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর আগে বাঁশুরি প্রধানত সহায়ক বা লোকজ যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, তিনিই একে পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় একক যন্ত্রে রূপ দেন।

প্রধান অবদান

  • দীর্ঘ ও নিম্ন-স্বরযুক্ত বাঁশুরির প্রচলন
  • ধ্রুপদ অঙ্গের প্রয়োগ
  • তিন সপ্তক জুড়ে বাঁশুরির বিস্তার
  • আলাপ–জোড়–ঝালার কাঠামো প্রতিষ্ঠা
  • বাঁশুরিকে কনসার্ট যন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি

ঘরানার বৈশিষ্ট্য

  • গভীর, ধীর, ধ্যানমগ্ন আলাপ
  • দীর্ঘ মীন্ড ও স্থির স্বর
  • ধ্রুপদী সংযম ও গাম্ভীর্য
  • শ্বাসনিয়ন্ত্রণে পারদর্শিতা

উল্লেখযোগ্য শিষ্য

  • পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া
  • পণ্ডিত দেবেন্দ্র মুরদেশ্বর
  • পণ্ডিত নিত্যানন্দ হলদিপুর
  • পণ্ডিত রঘুনাথ সেঠ

এই ঘরানাই আধুনিক বাঁশুরি ধারার মূল ভিত্তি।

পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া

হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ঘরানা (মৈহার–বাঁশুরি সমন্বয়)

প্রতিষ্ঠাতা: পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া

পন্নালাল ঘোষের প্রত্যক্ষ শিষ্য পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া বাঁশুরিকে আন্তর্জাতিক স্তরে জনপ্রিয় করে তোলেন।

প্রভাব

  • পন্নালাল ঘোষের ধ্রুপদী ভিত্তি
  • মৈহার ঘরানা (পণ্ডিত অন্নপূর্ণা দেবী)
  • খেয়াল গায়কির সৌন্দর্য

বৈশিষ্ট্য

  • গায়কি অঙ্গের প্রাধান্য
  • সূক্ষ্ম অলঙ্কার (কান-স্বর, মুর্কি)
  • আবেগময় ও লিরিক্যাল উপস্থাপনা
  • নিয়ম ও স্বাধীনতার ভারসাম্য

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

  • বৃন্দাবন গুরুুকুল
  • রাগ রিসার্চ সেন্টার (মুম্বাই ও ভুবনেশ্বর)

উল্লেখযোগ্য শিষ্য

  • পণ্ডিত রাকেশ চৌরাসিয়া
  • পণ্ডিত রণু মজুমদার
  • বহু আন্তর্জাতিক শিল্পী

বর্তমানে এটি সবচেয়ে প্রভাবশালী বাঁশুরি ঘরানা।

যুগলবন্দী - দেবেন্দ্র মুরদেশ্বর ও গুরু পান্নালাল ঘোষ
যুগলবন্দী – দেবেন্দ্র মুরদেশ্বর ও গুরু পান্নালাল ঘোষ

৩. দেবেন্দ্র মুরদেশ্বর – নিত্যানন্দ হলদিপুর ধারা

এই ধারা পন্নালাল ঘোষের মূল শাস্ত্রীয় রীতিকে কঠোরভাবে অনুসরণ করে।

বৈশিষ্ট্য

  • ধ্রুপদী শুদ্ধতা
  • অলঙ্কারে সংযম
  • রাগব্যাকরণের প্রতি অনুগত্য
  • শিক্ষামূলক ও গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি

এটি বিশেষত একাডেমিক ও গুরুতর রসিকদের কাছে জনপ্রিয়।

পণ্ডিত রণু মজুমদার

৪. রণু মজুমদার ধারা (আধুনিক ও ফিউশনধর্মী)

প্রতিষ্ঠাতা: পণ্ডিত রণু মজুমদার

এই ধারা শাস্ত্রীয় বাঁশুরিকে—

  • ফিউশন
  • চলচ্চিত্র সংগীত
  • বিশ্বসংগীত

এর সঙ্গে যুক্ত করে।

বৈশিষ্ট্য

  • দৃঢ় শাস্ত্রীয় ভিত্তি
  • তালগত পরীক্ষা
  • বহুমাত্রিক উপস্থাপনা

 

৫. শশাঙ্ক ও কর্ণাটক প্রভাব (আধুনিক সংমিশ্রণ)

যদিও শশাঙ্ক মূলত কর্ণাটকী বাঁশিবাদক, তাঁর প্রভাব হিন্দুস্তানি বাঁশুরিতেও পড়েছে—

  • দ্রুত তান
  • জটিল লয়
  • উত্তর–দক্ষিণ সংগীতের সেতুবন্ধন

 

বাঁশুরি ঘরানার কণ্ঠসঙ্গীত নির্ভরতা

বাঁশুরি ঘরানাগুলি মূলত—

  • ধ্রুপদ অঙ্গ
  • খেয়াল অঙ্গ
  • গায়কি অনুকরণ

এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই বাঁশুরি যেন “গান গায়”।

তুলনামূলক চিত্র

ঘরানামূল ধারাআবেগবৈশ্বিক প্রভাব
পন্নালাল ঘোষধ্রুপদধ্যানমগ্নভিত্তিমূল
চৌরাসিয়াখেয়াল–গায়কিলিরিক্যালবিশ্বব্যাপী
মুরদেশ্বর–হলদিপুরশুদ্ধ শাস্ত্রীয়সংযতএকাডেমিক
রণু মজুমদারফিউশনবহুমাত্রিকআধুনিক

 

বাঁশুরি ঘরানা কেবল সংগীতরীতি নয়—এটি এক জীবনদর্শন। এখানে শ্বাসই সংগীত, নীরবতাই ভাব, আর সংযমই সৌন্দর্য। পন্নালাল ঘোষের ধ্যানমগ্নতা থেকে চৌরাসিয়ার বিশ্বজনীন লিরিক্যাল ভাষা—সব মিলিয়ে বাঁশুরি আজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অনন্য কণ্ঠস্বর।

বাঁশুরি আমাদের শেখায়—
সংগীত সৃষ্টি হয় না, সংগীত প্রকাশিত হয়।

Leave a Comment